বিশ্ব আদিবাসী দিবস শুধু একটি উদযাপন নয়, এটি বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদার স্বীকৃতির দিন।
প্রতি বছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে এই দিনটি পালন করা হয়। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘ ৯ আগস্টকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
কারণ, ১৯৮২ সালের ৯ আগস্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে জাতিসংঘের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই দিনের মূল উদ্দেশ্য হলো আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং তাদের উন্নয়নের বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা। আদিবাসী বলতে সেইসব জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা কোনো অঞ্চলের প্রাচীনতম অধিবাসী এবং নিজেদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও জীবনধারা আজও ধরে রেখেছেন।
ভারতে সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাঁও, হো, ভিল, গোঁড, টোডা, খাসি, নাগা-সহ বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাঁও, ভূমিজ, লোধা, কোরা প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। আদিবাসী সমাজ প্রকৃতিকে মা হিসেবে সম্মান করে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়। তাদের উৎসব, নৃত্য, সংগীত, পোশাক ও লোককাহিনি পৃথিবীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অমূল্য সম্পদ। সহরায়, বাহা, কারামসহ নানা উৎসব তাদের ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।
আদিবাসী সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্মিলিত শ্রম এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক জীবনযাপন বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। ইতিহাসে বহু আদিবাসী বীর স্বাধীনতা ও ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম করেছেন। বিরসা মুন্ডা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ‘উলগুলান’ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আদিবাসী আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠেন। সিধু মুর্মু ও কানহু মুর্মু ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। রঘুনাথ মুর্মু সাঁওতালি ভাষার অল চিকি লিপির প্রবর্তক, যা আদিবাসী শিক্ষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অবদান। বিদু-চান্দান খেরওয়াল বীর, এবং দাড়েগে ধন তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে অন্যতম।
একসময় আদিবাসী সমাজ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে অনেকটাই বঞ্চিত ছিল। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। বর্তমানে বহু আদিবাসী শিক্ষার্থী বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করছেন। প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিচারব্যবস্থা, সেনাবাহিনী, ক্রীড়া ও প্রযুক্তিক্ষেত্রেও তাঁদের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে। সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার, শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা এই পরিবর্তনের বড় শক্তি। তবে এখনও বহু এলাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জমির অধিকার ও মৌলিক পরিষেবার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তাই উন্নয়নের পাশাপাশি আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব আদিবাসী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা সবার জন্য সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করে।
আদিবাসীরা কোনো করুণার নয়, সম্মান ও সাংবিধানিক অধিকারের দাবিদার। তাদের ইতিহাস সংগ্রামের, সংস্কৃতি গৌরবের এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার।
আসুন, বৈচিত্র্যকে সম্মান করি, বৈষম্য নয়; সমতা, ন্যায় এবং মানবিকতার সমাজ গড়ে তুলি। বিশ্ব আদিবাসী দিবসের বার্তা—পরিচয়কে সম্মান, সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ, অধিকারকে সুরক্ষা এবং সকলের জন্য সমান মর্যাদা।
- লিখেছেন – অনিন্দিতা সরেন
















