• Home
  • আদিবাসী
  • আদিবাসী সাঁওতাল Gen Z: নাচ-গানের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজ পরিবর্তনের পথে
আদিবাসী সাঁওতাল Gen Z তরুণ-তরুণীদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সাঁওতাল গর্বের প্রতীকী পোস্টার

আদিবাসী সাঁওতাল Gen Z: নাচ-গানের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজ পরিবর্তনের পথে

বর্তমান সময়ে আমরা একটি নতুন প্রজন্মের কথা প্রায়ই শুনি—Gen Z বা Generation Z। সাধারণভাবে ১৯৯৭ সাল থেকে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে Gen Z হিসেবে উল্লেখ করা হয়; তবে বিভিন্ন গবেষণায় এর সময়সীমা কিছুটা ভিন্নভাবে নির্ধারিত হয়েছে। এই প্রজন্ম এমন এক সময়ে বড় হয়েছে, যখন ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

Gen Z-কে তাই শুধু একটি বয়সের প্রজন্ম হিসেবে দেখলে হবে না। তারা এমন একটি প্রজন্ম, যারা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের খবর জানতে পারে, মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং চাইলে সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলনও গড়ে তুলতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতেও তরুণদের ডিজিটাল যোগাযোগ ও সামাজিক আন্দোলনের শক্তি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অন্যদের Gen Z যখন এগিয়ে যাচ্ছে

আজ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের Gen Z তরুণ-তরুণীরা শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা, গবেষণা, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, সামাজিক আন্দোলন ও রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। কেউ উদ্যোক্তা হচ্ছে, কেউ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজের সম্প্রদায়ের সমস্যা তুলে ধরছে, আবার কেউ পরিবেশ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয় নিয়ে সোচ্চার হচ্ছে। অর্থাৎ, অনেকের কাছে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়—এটি জ্ঞান, যোগাযোগ, সংগঠন এবং মতামত প্রকাশের শক্তিশালী হাতিয়ার।

তাহলে আদিবাসী সাঁওতাল Gen Z কোথায়?

এই প্রশ্নটি আমাদের নিজেদেরই করতে হবে।

আমাদের আদিবাসী, বিশেষ করে সাঁওতাল সমাজের Gen Z-দের মধ্যেও অসাধারণ প্রতিভা রয়েছে। অনেকেই উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে, চাকরি করছে, প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, ভালো কনটেন্ট তৈরি করছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি বড় অংশের মধ্যে নিজের সমাজ, ইতিহাস, অধিকার, শিক্ষা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রয়োজনীয় সামাজিক সচেতনতার অভাব চোখে পড়ে।

ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে অনেক সময় মনে হয়, আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যন্ত সক্রিয় হলেও সেই সক্রিয়তার বড় অংশ সীমাবদ্ধ থাকে বিনোদন, নাচ-গান, ছবি, রিলস কিংবা উৎসব-কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে।

নাচ-গান, উৎসব, মেলা, পরব—এসব আমাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো অবশ্যই থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু সংস্কৃতি উদযাপন করলেই কি একটি সমাজ এগিয়ে যায়?

যে তরুণ তার সংস্কৃতিকে ভালোবাসে, তাকে তার সমাজের ইতিহাসও জানতে হবে।
যে তরুণ নিজের ভাষায় গান গায়, তাকে নিজের ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হবে।
যে তরুণ আদিবাসী পরিচয় নিয়ে গর্ব করে, তাকে সেই পরিচয়ের অধিকার ও সাংবিধানিক সুরক্ষা সম্পর্কেও জানতে হবে।

সোশ্যাল মিডিয়া হতে পারে পরিবর্তনের অস্ত্র

আদিবাসী Gen Z-এর হাতে আজ এমন একটি শক্তি রয়েছে, যা আগের প্রজন্মের হাতে ছিল না—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।

বিশ্বের বিভিন্ন Indigenous youth-এর ক্ষেত্রে গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিচয়, সংস্কৃতি, সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সামাজিক পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তাহলে আমাদের তরুণরা কেন এই শক্তিকে আরও বেশি করে নিজেদের সমাজের কাজে ব্যবহার করবে না?

ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে শুধু নাচের ভিডিও নয়—

তাহলেই সোশ্যাল মিডিয়া শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম থাকবে না; হয়ে উঠবে সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যম।

পরিবর্তন আসবে কীভাবে?

পরিবর্তনের জন্য প্রথমেই দরকার মানসিকতার পরিবর্তন।

আমাদের Gen Z-কে বলতে হবে—

“তুমি শুধু দর্শক নও, তুমি তোমার সমাজের ভবিষ্যৎ।”

প্রতিটি গ্রামে তরুণদের নিয়ে পাঠচক্র, ইতিহাসচর্চা, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, ডিজিটাল সচেতনতা কর্মসূচি এবং সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তোলা যেতে পারে। তরুণদের নিয়ে ছোট ছোট ডিজিটাল টিম তৈরি করে আদিবাসী সমাজের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলি তুলে ধরা যেতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, রাজনীতির অন্ধ অনুসারী নয়—যুক্তিবাদী, শিক্ষিত, সচেতন এবং প্রশ্ন করতে শেখা তরুণ প্রজন্ম তৈরি করতে হবে।

আগামী দিনের ডাক

আগামী দিনের সাঁওতাল Gen Z-এর কাছে আমার প্রশ্ন—

আমরা কি শুধু বছরে কয়েকটি পরব-মেলা-উৎসবে নাচব, গান গাইব এবং ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করব?

নাকি আমরা আমাদের সমাজের জন্য কিছু করব?

আমরা কি আমাদের ইতিহাস জানব?
আমরা কি আমাদের ভাষাকে বাঁচাব?
আমরা কি আমাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য কাজ করব?
আমরা কি আমাদের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে জানব?
আমরা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তির সঙ্গে কথা বলব?
আমরা কি আমাদের সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াব?

উপসংহার

আদিবাসী Gen Z-কে সংস্কৃতি ভুলতে হবে না; বরং সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান ও সামাজিক সচেতনতার যোগ ঘটাতে হবে।

নাচ-গান আমাদের পরিচয়কে বাঁচিয়ে রাখবে, কিন্তু শিক্ষা আমাদের শক্তিশালী করবে, সচেতনতা আমাদের সংগঠিত করবে এবং নেতৃত্ব আমাদের ভবিষ্যৎ তৈরি করবে।

আজকের সাঁওতাল Gen Z যদি শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নয়, নিজের সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে শুরু করে, তাহলে আগামী দিনে আদিবাসী সমাজে একটি নতুন জাগরণ সম্ভব।

তাই আজকের ডাক—
“শুধু উৎসবের মঞ্চে নয়, এবার সমাজ পরিবর্তনের মঞ্চেও এগিয়ে আসুক আদিবাসী Gen Z।”

নিজেকে বদলাও, সমাজকে বদলাও—
শিক্ষিত হও, সচেতন হও, সংগঠিত হও এবং নিজের সমাজের জন্য এগিয়ে এসো।

কলমে- জাগর মুর্মু

Related Posts

সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলনের সময় চুনি কোটালকে মনে রাখা কেন জরুরি?

কলমে- জাগর মুর্মু ভারতের সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্টে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংরক্ষণবিরোধী…

ByByAJM Aug 25, 2026

  কবিতা

মাটি বিক্রি হয় না প্রকৃতির পরম বন্ধু এবং সংস্কৃতির আদি ধারক হলেন আমাদের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা। আদিবাসী সংস্কৃতির…

ByByAJM Aug 9, 2026

৯আগস্টবিশ্বআদিবাসীদিবস: ইতিহাস, অধিকার, ঐতিহ্যওআত্মমর্যাদারঅঙ্গীকার

বিশ্ব আদিবাসী দিবস শুধু একটি উদযাপন নয়, এটি বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদার স্বীকৃতির দিন। প্রতি…

ByByAJM Aug 9, 2026

বিশ্ব আদিবাসী দিবসে আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান 

বিশ্ব আদিবাসী দিবসে আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান                         …

ByByAJM Aug 9, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top